আনন্দকানন
RNI no -WBBIL/2019/79312
Oops! Looks like this custom HTML web element hit a plan limit and is taking a little break.
Please ask the website owner to upgrade and bring it back to action!
Oops! Looks like this custom HTML web element hit a plan limit and is taking a little break.
Please ask the website owner to upgrade and bring it back to action!
Oops! Looks like this custom HTML web element hit a plan limit and is taking a little break.
Please ask the website owner to upgrade and bring it back to action!
Oops! Looks like this custom HTML web element hit a plan limit and is taking a little break.
Please ask the website owner to upgrade and bring it back to action!
আনন্দকানন
RNI no -WBBIL/2019/79312
প্রচ্ছদ কাহিনী
সুকোমল সুকুমার
সুকন্যা দত্ত কুইলা
"শুনতে পেলাম পোস্তা গিয়ে
তোমার নাকি মেয়ের বিয়ে"...
পাড়ার জলসায় যখন রবীন্দ্রজয়ন্তী উপলক্ষে এ পদ্যখানি ঝেড়ে বলে এসেছিলুম স্মার্টলি, তখন আমার বয়স চার কি পাঁচ। কি করবো বলুন! সক্কালবেলা হুড়ুম করে এসে 'পদ্য বলতে হবে, পদ্য বলতে হবে' বলে বিকেলবেলা সবাই মিলে এই বাচ্চা মানুষটাকে অর্থাৎ আমাকে তুলে দিল স্টেজে। আলো ধাঁধানো চোখ যখন সয়ে এলো, দেখলুম শুধু সারি সারি কালো মাথা— কার জন্মদিন, কী পদ্য শিখেছি কিচ্ছুটি মনে রইলো না। এমন সময় দ্রৌপদীর সম্মানরক্ষার্থে সখা কৃষ্ণের মত আমার ত্রাতা হয়ে সে মুহূর্তে পাশে এসে দাঁড়ালেন ''সুকুমার রায়"। আমিও চিরকাল স্টেজে মারা ওস্তাদ, দিলুম সুকুমার রায়ের পদ্যখানা শুনিয়ে। পরে মায়ের কাছে হাপুস নয়নে কেঁদেছিলাম সকালে পই পই করে শিখিয়ে দেওয়া সত্ত্বেও রবি ঠাকুরের "পূজার সাজ" পদ্যখানি না বলতে পারার দুঃখে। মা আমার মাথায় সান্ত্বনার হাত বুলিয়ে বলেছিলেন, "দূর বোকা মেয়ে! কাঁদিস কেন! সবাই গঙ্গাজলে গঙ্গা পুজো করে, রবি ঠাকুরের জন্মদিনে তাঁরই লেখা তাঁকেই শোনায়। তুই তো অন্য কিছু শুনিয়েছিস, রবি ঠাকুর মনে মনে আজ ভারী খুশি হয়েছেন। জানিস, রবি ঠাকুর সুকুমার রায়কে কত ভালোবাসতেন!' সেই থেকে আমার মেয়েবেলার সুকুমার সুকোমল দিনগুলি কাটতে লাগলো তাঁর হাত ধরে। আরও আরও এগিয়ে গেলাম তাঁর দিকে। আর শুধু সুকুমার রায় নন ওঁর পুরো পরিবারই আমাদের ছোটবেলার এক পরম সাথী। সেই উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী থেকে শুরু করে লীলা মজুমদার, সুখলতা রাও হয়ে সত্যজিৎ রায় অব্দি। ছানার সন্দেশের চেয়ে পত্রিকা 'সন্দেশ'ও কিছু কম লোভনীয় ছিল না আমার কাছে। এঁদের সবার মধ্যে অবশ্য সুকুমার রায় ছিলেন বিশেষ বন্ধু (আমরা এখন যাকে বলি বেস্ট ফ্রেন্ড)। তিনি ছিলেন আমার ছোটবেলার সেই রঙিন শার্সিওলা জানলা যার মধ্যে দিয়ে দেখলে গোটা পৃথিবীটাকে রঙিন লাগত! রবীন্দ্রনাথ যদি আমার জীবনের চিরসখা হয়ে থাকেন, তাহলে সুকুমার রায় আমার একান্ত সহচরী। ভাবছেন উনি আমার 'সহচরী' কেমন করে?! একটি মেয়ের মেয়েবেলাকার দুপুর-বিকেল কাটানোর সঙ্গীনি তার যতটা কাছের হয় উনি আমার ততটাই কাছের। আর তাই আজও আমার বেদম মনের দুঃখে আমি ওঁর কাছেই আগে ছুটে যাই।
আমার চিরকালের একখানা স্বভাব আছে বুঝলেন, সবার ছোটবেলার দিনগুলোকে বড্ডো জানার ইচ্ছে। আমার নিজের কিশোরীবেলাতে আমার একদম ক্ষুদেবেলার কাহিনী জানার জন্য আমি আমার মাকে যারপরনাই জ্বালাতন করতাম। "The childhood shows the man as morning shows the day."—এ কথাখানি আমি খুব মানি। বিশেষতঃ বিখ্যাত মানুষদের শৈশব আমাকে বড় টানে। বোধহয় মনে মনে নিজের শৈশবের সাথে তাঁদের শৈশবের আচরণের কতখানি ফারাক তা বুঝে নিতে চাই।ভাবখানা এমন, যেন ওইরকম একটি শৈশব কাটালেই বুঝি আমিও তাঁদের মত একখান মস্ত কিছু হয়ে যেতুম!
যাইহোক, এবছর হিসেব কষে দেখলুম পুজোর সময় (৩০শে অক্টোবর, ১৮৮৭) সুকুমার রায় তাঁর একশ চৌত্রিশতম জন্মদিনে পা দেবেন আর অমনি আমার তাঁর ছোটবেলার ঘটনাগুলো আবার পড়ে দেখার ইচ্ছে চাগাড় দিয়ে উঠলো। ইচ্ছে হলো যিনি আমাদের ছোটোবয়সটাকে এতো বর্ণময় করে তুলেছেন তাঁর ছোটবেলা কতখানি রামধনু রঙে রাঙানো ছিল তা জানার, তা একটু তুলে ধরার। আসলে ৩৬ বছরের স্বল্প আয়ুর অল্প জীবনে তাঁর ছেলেবেলাখানাই যা দীর্ঘ, তাই সেটাই আমার একমাত্র সম্বল!
১৩ নম্বর কর্নওয়ালিস স্ট্রিটের বাড়িতে সুকুমার ও ভাইবোনদের জন্ম (ছোট ভাই সুবিমল বাদে)। ছয় ভাইবোনের মধ্যে তিনি ছিলেন দ্বিতীয় | জ্যেষ্ঠা সুখলতা , দ্বিতীয় সুকুমার, তৃতীয় পুণ্যলতা, চতুর্থ সুবিনয়, পঞ্চম শান্তিলতা ও কনিষ্ঠ সুবিমল। সুকুমারসহ প্রতিটি ভাইবোনই ছিলেন প্রখর প্রতিভাসম্পন্ন। তাঁদের খুড়তুতো বোন লীলা মজুমদার তাঁদের সম্পর্কে বলেছেন, ''উপেন্দ্রকিশোরের সব ছেলেমেয়ের মধ্যে আশ্চর্য সাহিত্য-প্রতিভা প্রকাশ পেয়েছিল। সবার বড় সুখলতা রাও তাঁর পরিচয় দেওয়া বাহুল্য মাত্র। আমাদের ছোটবেলায় তাঁর 'আরো গল্প' গল্পের বই এবং আরো পরে লেখা 'গল্প আর গল্প', 'নিজে লেখ', 'নিজে পড়' ইত্যাদি যথার্থ আদর পেয়েছে।… সুখলতার পর পুণ্যলতা, তাঁর লেখা খুদে খুদে গল্প এখনো সন্দেশের পাতায় দেখা যায়। তাঁর 'ছেলেবেলার দিনগুলি' পড়ে কি ছেলে কি বুড়ো আনন্দে অধীর হবে।" সুকুমার রায়কে যদি সত্যিই খানিক জানতে হয় তাহলে পুণ্যলতার লেখা 'ছেলেবেলার দিনগুলি' পড়তেই হবে, পুণ্যলতার লেখা বাদ দিয়ে সুকুমার রায় বড়োই অধরা আমাদের কাছে। আর পুণ্যলতার সে লেখা স্বভাবেও ভারী চমৎকার। হালকাপলকা শব্দের পালকে ভাসিয়ে নিয়ে তাঁর স্মৃতিচারণ এমন আবেশ তৈরী করে আমাদের মনে যেন মনে হয় টাইম মেশিনে চড়ে বোধকরি তাঁদেরই পাশে, তাঁদেরই সাথে কাটাচ্ছি দিনগুলি। পুণ্যলতার তাঁর লেখার তুলি দিয়ে সবকটি ভাইবোনটিকে ক্যানভাসে এমন করে এঁকেছেন যেন মনে হয় সব বুঝি জীবন্ত। সুকুমার, সুখলতা কিংবা পুণ্যলতাসহ সব ভাইবোনগুলি যেন একইরকম। সবাই মস্ত গুণী, সবারই শিশুসাহিত্যের ওপর অসীম অবদান, সবাই যেন একই ছাঁচে গড়া, আর তাই এঁদের প্রত্যেকের রচনাগুলিতে তেমনই নরম সাবলীলতার ছোঁয়া। যদিও সুকুমারের চ্ছটায় বাকি সবাই ঢেকেই যেতেন, লীলা মজুমদার এ প্রসঙ্গে বলেছেন, "বড়দা তাঁর ব্যক্তিত্বের দীপ্তি দিয়ে সকলের চোখ এমনি ধাঁধিয়ে রেখেছিলেন যে তাঁর ছায়ায় ছায়ায় যে আরেকজন অসাধারণ মানুষ সব সময় ঘুরে বেড়াতেন তাঁর দিকে কারো চোখ পড়ত না।"— তিনি সুবিনয় রায়ের কথা বলেছিলেন যাঁর ডাকনাম ছিল মণি। উদার, হাসিখুশি ও ভারী মজার মনের মানুষ ছিলেন তিনি।
লীলা মজুমদারের লেখা থেকে এই ভাইবোনদের সম্পর্কে আরও কিছু ধারণা পাওয়া যায়, "পুণ্যলতার ছোট সুবিনয়ও ৫২ বছর বয়সে পরলোকগমন করেন। ইউ.রায়.এন্ড সন্স্ যাঁরা কিনেছিলেন, তাঁরা কয়েকবছর ' সন্দেশ ' প্রকাশ করেছিলেন সুবিনয়ের সম্পাদনায়।... বৈজ্ঞানিক দৃষ্টি ছিল তাঁর, মৌলিক রসেও গল্পও অনেক লিখেছিলেন ও খেলাধূলা, ধাঁধা ইত্যাদির বই প্রকাশ করেছিলেন...। ....সুবিমল হলেন সবার ছোট...।তাঁর লেখা 'বেড়ালের হার্মোনিয়াম' গল্প দুঃসময়ে মন ভালো করার অব্যর্থ ওষুধ। ছোটবোন একজন ছিলেন শান্তিলতা, মাত্র ২৬/২৭ বছর বয়সে মারা যান।" শান্তিলতার লেখা কবিতাও সেসময় সন্দেশে বেরিয়েছিল তার মধ্যে একটি হল,
'ওগো রাঁধুনি শোন গো শোন!'
সে কবিতা যে কী মজার ছিল কী বলবো! তিনি লীলা মজুমদার ও তাঁর বোনকে নিয়ে ভারী আমুদে একটি ছড়া লিখেছিলেন,
"পিঠোপিঠি দুই বোন সুকু আর লীলা
পড়তে বসে বই ফেলে করছে পুতুলখেলা।
তাই না দেখে প্রভাতরঞ্জন উঠলেন রাগে ফুলে।
চুপিচুপি বেঁধে দিলেন দুই জনার চুলে।
বাইরে গিয়ে যেই ডেকেছে লুচি খাবি আয়!
অমনি তারা হ্যাঁচকা টানে বাপরে কি চেঁচায়!"
সবাই শান্তিলতাকে ডাকতো 'টুনি' বলে, আর তাঁর আঁকার হাতখানিও নাকি ছিল চমৎকার। কিন্তু মাত্র ২৪ বছরে বয়সেই তিনি নিউমোনিয়ায় মারা যান। মৃত্যুশয্যায় 'দাদা!'—বলে একটি ডাক দিয়েই তিনি চলে যান আর হয়তো যাওয়ার আগে এরই ছোঁয়া দিয়ে গেছিলেন সুকুমারেরও, তাই তিনিও অত কম বয়সে চলে গেলেন। কালাজ্বরের কালোছায়া কোন এক আবছা রাতে তাঁর চোখে ঘনিয়ে আনলো চিরঘুমের ঘোর আর তিনিও ওমনি হুট্ করে তাঁর সব গানের পালা সাঙ্গ করে কোন মেঘ মুলুকের দেশে পাড়ি দিলেন কে জানে!! বলেছিলাম না এঁরা ভাইবোনেরা সবাই কেমন যেন একই ধাঁচের...
সুকুমারের মৃত্যুর খবরে ভীষণ আঘাত পেয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। উপেন্দ্রকিশোরের সাথে রবীন্দ্রনাথের প্রগাঢ় সখ্যতা অনেকদিনের আর সে সুবাদেই সুকুমার রায়কে খুব স্নেহ করতেন রবীন্দ্রনাথ। রবীন্দ্রনাথ যতদিন লন্ডনে ছিলেন সুকুমার রায় ছিলেন তাঁর সর্বক্ষণের সাথী। কবির বাড়ি নিমন্ত্রন খাওয়া, সান্ধ্যকালীন সভায় প্রবন্ধ পাঠ করা এসবই বিদেশে থাকাকালীন ভালোই চলতো তাঁদের মধ্যে। এমনকি কবি ভেবেছিলেন যে সুকুমার তৎসহ আরও কয়েকজনকে নিয়ে তিনি ফ্রান্স-জার্মানি সফর করবেন। সুকুমার-সুপ্রভার বিয়েতেও তিনি উপস্থিত ছিলেন। কবির জীবদ্দশায় অনেক মৃত্যু দেখা তাঁর দৃঢ় মনটিকে সুকুমারের অকালমৃত্যু যেন খানিকটা টলিয়ে দিয়েছিল। ২৬শে ভাদ্র মন্দিরের উপাসনা শেষে রবীন্দ্রনাথ সুকুমার রায়কে স্মরণ করে একটি নাতিদীর্ঘ ভাষণ দিয়েছিলেন যেটি 'মন্দিরের উপদেশ' নামে পরবর্তীকালে 'শান্তিনিকেতন পত্রিকা'-য় ভাদ্র ১৩৩০ সংখ্যায় পত্রস্থ হয়েছিল। সেই ভাষণের সামান্য কিছু অংশ আমি তুলে ধরছি, "আমি অনেক মৃত্যু দেখেছি, কিন্তু এই অল্পবয়স্ক যুবকটির মতো, অল্পকালের আয়ুটিকে নিয়ে মৃত্যুর সামনে দাঁড়িয়ে এমন নিষ্ঠার সঙ্গে অমৃতময় পুরুষকে অর্ঘ্য দান করতে প্রায় আর কাউকে দেখিনি। মৃত্যুর দ্বারে দাঁড়িয়ে অসীম জীবনের জয়গান তিনি গাইলেন। তাঁর রোগশয্যার পাশে বসে সেই গানের সুরটিতে আমার চিত্ত পূর্ণ হয়েছে।"
"...সেদিন সেই যুবকের মৃত্যুশয্যায় দেখ্লুম সুদীর্ঘকাল দুঃখভোগের পরে’ জীবনের প্রান্তে দাঁড়িয়ে মৃত্যুর মতো অতবড় বিচ্ছেদকে, প্রাণ যাকে পরম শত্রু বলে’ জানে, তাঁকেও তিনি পরিপূর্ণ করে দেখ্ তে পেয়েচেন। তাই আমাকে গাইতে অনুরোধ করেছিলেন—
'আছে দুঃখ, আছে মৃত্যু, বিরহ দহন লাগে
তবুও শান্তি, তবু আনন্দ, তবু অনন্ত জাগে..."
সুকুমারের সহধর্মিণী সুপ্রভাকে চিঠিতে লিখলেন, "মৃত্যুকে তিনি মহীয়ান করে', তাকে অমৃতলোকের সিংহদ্বার করে' দেখিয়ে গেছেন, আমরা যারা মর্ত্যলোকে আছি, আমাদের প্রতি তাঁর এই একটি মহার্ঘ দান। এই কথা স্বরণ করে' তুমি সান্ত্বনা লাভ কর; ঈশ্বর তোমায় শান্তি দিন, তোমার শোককে কল্যাণে সার্থক করুন।" রবীন্দ্রনাথ যখন প্রেতচর্চা করতেন সুকুমার রায়কে প্ল্যানচেটে ডেকেছেন বহুবার। তাঁর সাথে মৃত্যুর পর আত্মার ইচ্ছা-অনিচ্ছা, পার্থিব আকর্ষণ, ধর্মচিন্তা প্রভৃতি বিষয় নিয়ে আলোচনা করতেন। সুকুমার তাঁর শিশুপুত্র সত্যজিৎ-এর ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তাপ্রকাশ করতেন রবীন্দ্রনাথের কাছে, এমনকি প্ল্যানচেটের মাঝে সুকুমার রায় হটাৎ অনুরোধ করতেন কবিকে গান গাইতে,
"তরী আমার হটাৎ ডুবে যায়" ...
সুকুমারের শৈশব ছিল বড় সরল, বড় সুন্দর, বড় উজ্জ্বল! তাই বুঝি সে সরল সৌন্দর্য্য তাঁর লেখাতেও প্রতিফলিত হয়েছে যা পড়তে পড়তে আমাদের মুখে আজও আনে এক উজ্জ্বলতার সরল-সুন্দর হাসি। তাঁদের স্কুলজীবনটি ছিল ভারী চমৎকার। তাঁদের কর্ণওয়ালিশ স্ট্রিটের বিরাট বাড়ির সামনের দিকটিতেই চলতো 'ব্রাহ্ম বালিকা শিক্ষালয়', এখানেই সুকুমারসহ বাকি ভাইবোনেরা প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করেন (তখন এ স্কুলে বার বছর অব্দি ছেলেরাও পড়াশোনা করতে পারতো। দ্বারকানাথ গাঙ্গুলির (সুকুমারের দাদু) ছেলেমেয়েরাও এই স্কুলে পড়তেন। দ্বারকানাথ গাঙ্গুলির দ্বিতীয়া স্ত্রী কাদম্বিনীর সন্তানদের সাথে সুকুমার ও বাকিদের যথেষ্ট সদ্ভাব ছিল—প্রভাতচন্দ্র, প্রফুল্লচন্দ্র, নির্মলচন্দ্র প্রভৃতি সম্পর্কে তাঁদের মামা হওয়া সত্ত্বেও সুকুমারের বাল্যসঙ্গী ছিলেন। এছাড়া সুকুমার রায়ের কাকাদের— সারদারঞ্জন, মুক্তিদারঞ্জন, কুলদারঞ্জন, প্রমদারঞ্জনের (এঁরা সবাই উপেন্দ্রকিশোরের নিজের ভাই , উপেন্দ্রকিশোরের পিতা হিসেবে আমরা যাঁর নাম জানি সেই হরিকিশোর রায় ছিলেন উপেন্দ্রর পালক পিতা।হরিকিশোর তাঁর এক জ্ঞাতিভ্রাতা শ্যামসুন্দর মুন্সী/কালীনাথ রায়ের দ্বিতীয় সন্তানকে দত্তক নেন এবং তাঁর 'কামদারঞ্জন' নাম পাল্টে 'উপেন্দ্রকিশোর' নাম দিয়ে তাঁকে দত্তকপুত্র হিসেবে গ্রহণ করেন। দত্তক-পরবর্তীকালে অবশ্য হরিকিশোরের একটি পুত্র ও দুই কন্যার জন্ম হয়) ছেলেমেয়েরা এবং পিসি মৃণালিনী (উপেন্দ্রর সহোদরা) ও পিসেমশাই হেমেন্দ্রকুমার বসুর (ইনি 'কুন্তলীন' তেলের আবিষ্কর্তা হিসেবে বিশেষরূপে বিখ্যাত) ছেলেমেয়েরা ও সুকুমারসহ সবকটি ভাইবোন সব একসাথে বড় হয়েছেন | যৌথ পরিবারের শিক্ষা-সাহচর্য যে মানুষের মনে কতখানি প্রভাব ফেলে তা আমরা বিলক্ষণই জানি।এই বাড়ির একতলায় স্কুল আর দোতলায় স্কুলের মেয়েদের বোর্ডিং। ছোটদের ক্লাস হত পুজোর দালানে। 'কিন্ডারগার্টেন' শিক্ষাপদ্ধতিতে অনুসারে এ স্কুলের শিক্ষাব্যবস্থা ছিল।তাই তখনকার দিনের হিসেবে খুব আধুনিক মানের স্কুল ছিল এটি। মামা, মাসী, ভাই-বোন ছাড়াও সুকুমারদের আর একজন সাথী ছিলেন— সুরমা যিনি ছিলেন উপেন্দ্রকিশোরের প্রতিবেশী রামকুমার বিদ্যারত্নের মেজমেয়ে। রামকুমারের স্ত্রী গত হওয়ায় তিনি সংসারত্যাগী হন তখন তাঁর তিনমেয়ের মধ্যে বড় মেয়েটি বোর্ডিংয়ে রেখে, ছোট মেয়েটিকে শিবনাথ শাস্ত্রী মহাশয় ও মেজ মেয়েটিকে মানুষ করার দায়িত্ব নেন উপেন্দ্রকিশোর ও বিধুমুখী। আর শুধু মানুষ করাই নয় সুরমার সঙ্গে উপেন্দ্রকিশোর নিজের ভাই প্রমদারঞ্জনের বিয়েও দেন। এই সুরমাই হলেন সুকুমারের খুড়তুতো বোন লীলা মজুমদারের মা। সুকুমার ও ভাইবোনেরা সুরমাকে মাসী বলে ডাকতো (যদিও তিনি ছিলেন সুকুমারের দিদি সুখলতার চেয়ে মাত্র দু'বছরের বড়) আর ভীষণ ভালোবাসতো। একবার সুকুমার খেলতে খেলতে সুরমার মুখে ব্যাটের এক বাড়ি দিয়ে ফেললেন, অমনি ঠোঁট কেটে রক্ত, কান্নাকাটি। উপেন্দ্রকিশোর যেই সুকুমারকে বকতে গেলেন অমনি সুরমা "বেশি লাগেনি! বেশি লাগেনি" বলে বাধা দিয়ে উঠলেন। সুরমা উপেন্দ্রকিশোরকে ডাকতেন 'দাদাবাবু' বলে আর প্রচন্ড ভালোবাসতেন তাঁকে। সারাজীবন মনে অসীম কৃতজ্ঞতা পোষণ ও অসম্ভব ভক্তি করে গেছেন সুরমা তাঁকে। উপেন্দ্রকিশোরের মৃত্যুসংবাদে শোকে দুঃখে স্তব্ধ হয়ে গেছিলেন তিনি, খালি বলতেন "ঐ আমি সত্যিকারের বাপকে হারিয়ে ছিলাম..."— এ সব কথা লীলা মজুমদার তাঁর আত্মজীবনী "পাকদন্ডী"-তে লিখে গেছেন।
সুকুমার রায়ের এ মজার বাড়িখানি ও তাঁদের মনোগ্রাহী জীবনযাত্রা সম্পর্কে উপেন্দ্র-দুহিতা পুণ্যলতার স্মৃতি:
''যে বাড়িতে আমাদের জন্ম হয়েছিল আর শিশুকাল কেটেছিল, সেটা ছিল বিরাট একটা সেকেলে ধরনের বাড়ি। তার বাইরের অংশে আমাদের স্কুল হ'ত, ভিতরের অংশে, দোতলায় আমরা থাকতাম আর তিনতলায় আমাদের দাদামশাইরা থাকতেন।…
…দোতলার এক সারিতে আমাদের কয়েকখানি ঘর, তার সামনে চওড়া একটা বারান্দা। ঘরের ভেতরকার কতরকম দৃশ্য ছবির মত মনে পড়ে।বাবা বেহালা বাজাচ্ছেন, ছবি আঁকছেন। মা সেলাই করছেন, ঘরের কাজকর্ম করছেন।
…কিন্তু ঘরের চেয়ে বারান্দার কথাই বেশি মনে পড়ে।.. ভিতরের এই বড় বারান্দাটাই ছিল আমাদের আড্ডার জায়গা। খেলাধূলা, পড়াশোনা, গল্পসল্প, বেশিরভাগ এখানেই হ'ত। জন্মদিন প্রভৃতি উৎসবে এইখানেই সারি সারি পাত পেতে নিমন্ত্রণ খাওয়া হ'ত। সন্ধেবেলায় মাঝে মাঝে অনেক ছেলেমেয়ে জড়ো হয়ে এখানে "ছায়া-বাজি" (Magic Lantern ও Shadow-play) দেখতাম। রোজ সন্ধ্যায় ছিল এখানে বসে গল্প শোনার পালা— কত দেশ-বিদেশের কথা, রূপকথা, রামায়ণ মহাভারতের গল্প, বাবা-মায়ের ছেলেবেলার গল্প, হাসির গল্প, দুঃখের গল্প, যুদ্ধ ও বিপদের কত রোমাঞ্চকর গল্প |" — তাঁদের ছেলেবেলার এ সুমধুর স্মৃতিখানি আমাদেরই চোখের সমুখে কেমন ছবির মত যেন ভেসে উঠছে, না!!
এই বালখিল্যদের নানা রকমের কান্ডকারখানায় মজে থাকতো সারাবাড়ি সবসময়, মাঝে মাঝে দুষ্টুমির দৌরাত্ম্য এতটাই বেড়ে যেত যে তা অনেকসময় দুর্ঘটনায় পর্যবসিত হত— কাদম্বিনী ও দ্বারকানাথের এক ছেলে যাকে সবাই ডাকতো মংলু বলে তিনি স্বভাবে ছিলেন ভারী পেটুক মানুষ। এটা ওটা সেটা তিনি সমানে খেতেই থাকতেন। একদিন তিনি দেখলেন তাঁর দিদিমা এক হাঁড়ি দই নিয়ে ঘরে রেখে দরজায় শিকল তুলে দিয়ে চলে গেলেন। ওদিকে তাঁর তো আর তর সয় না, দই তাঁকে খেতেই হবে। একটু ফাঁকা দেখে তিনি একটি টুলে উঠে শিকল খুলে, খাটের তলা থেকে হাঁড়ি বার করে ইয়া এক খাবলা দই মুখে পুরেই ভয়ানক চেঁচাতে লাগলেন— আরে বাবা! সেতো দই ছিলই না ওটা ছিল তাজা চুন। তারপর সেই চুনে মুখ পুড়ে গিয়ে সেকি অবস্থা, খাওয়া দাওয়া সব বন্ধ। আচ্ছা এ গল্পটা খানিক চেনা চেনা ঠেকছে না?! আমার তো ভীষণ চেনা ঠেকছে। হ্যাঁ, চেনা লাগবেই তো এ ঘটনা যে সুকুমার রায় তাঁর "পেটুক" গল্পে লিখে গেছেন শুধু তাঁর মংলুমামার নামটা পাল্টে তিনি হরিপদ করেছিলেন পাছে তিনি বেদম লজ্জ্বা পান!! সুকুমারের গল্পের রসদ তাঁদের বাড়িময় ছড়ানো ছিল।
এবার আর এক মামার কথা বলি তিনি হলেন জংলু মামা (তাঁর নাকি মাথা ভর্তি ঝাঁকড়া চুল আর মুখ ভর্তি দাড়ি ছিল, যাকে বলে নামের সাথে একদম উপযোগী। কিন্তু ছোটবেলায় তো তাঁর দাড়িগোঁফ ছিল না তবে তখন তাঁর নাম জংলি ঠিক কী কারণে রাখা হয়েছিল তা ঠিক জানা যায়নি)। তাঁর ভালো নাম প্রভাত গাঙ্গুলি যিনি বড় হয়ে মস্ত বড় সাংবাদিক হয়েছিলেন। সেবার ব্রাহ্মসমাজ পাড়ায় সুকুমারের বন্ধু বিমলাংশুপ্রকাশ রায়ের বাড়ির ছাদে ফ্রেটারনিটি ক্লাব স্থাপিত হল।বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়স্বজন সবাই সে ক্লাবে আসতেন। জংলুমামাও যেতেন। একদিন ঠিক করা হল কবিতা লেখার আসর হবে। সুকুমার বললেন, 'যে যা পার এখনই কবিতা লিখে আমাকে দাও।' সবাই দিলেন, সুকুমার একটা পর একটা কাগজ খুলে খুলে পড়তে লাগলেন, হটাৎ একটা কাগজ থেকে পড়লেন—
"ভীষণ ডিগবাজি
খেতেন শিবাজী।"
তলায় নাম লেখা প্রভাত গাঙ্গুলি। সে শুনে তো জংলু মামা 'আমি লিখিনি, আমি মোটেই লিখিনি' বলে লাফিয়ে উঠলেন। পরে বোঝা গেল ওই কান্ডটি ছোটভাই নানকু অর্থাৎ সুবিমল রায়ের কীর্তি!!
সুকুমার বাল্যকালে ভীষণ অস্থির-চঞ্চল আর বেশ খানিকটা দুষ্টু ছিলেন। তবে লক্ষ করে দেখেছি মোটামুটি সব প্রতিভাবান ব্যক্তিদেরই ছোটবেলায় দুষ্টু হওয়া বাধ্যতামূলক ছিল— বিদ্যাসাগরমশাই ছোটবেলায় ভয়ঙ্কর দুষ্ট ছিলেন আর সে কথা তিনি তাঁর আত্মপরিচয়ে স্বীকার করে গেছেন, স্বামী বিবেকানন্দ ছোটবেলায় এতো দুষ্টু ছিলেন যে তাঁর মা তাঁর মাথায় জল ঢেলে 'শিব! শিব!' জপ করলে তবে ছেলে ঠান্ডা হত। আর সুকুমার রায় ছেলেবেলায় একটি ছোট লাঠি হাতে বোর্ডিংয়ের মেয়েদের সারা ছাত ধরে তাড়া করে বেড়াতেন। কলের খেলনাগুলোকে ভেঙে সেগুলোর কলকব্জা দেখার চেষ্টা করতেন, এমনকি বাজনাও ভেঙে দেখতেন ওর আওয়াজের উৎস কোথায় (ছোটবেলায় অমন ইঞ্জিনিয়ারিং স্বভাব আমারও খানিক ছিল বাপু -- যদিও তা আর কাজে লাগল কই!)। সেবারতো বাড়ির তিনতলার পাঁচিলের গায়ের একটি ফুটো দিয়ে গলে কার্নিশে নামার চেষ্টা চালাচ্ছিলেন। এমন সময় তাঁর মামা শ্রী সতীশচন্দ্র গঙ্গোপাধ্যায় (সুকুমার রায়ের মাতা বিধুমুখীর ভাই, দ্বারকানাথ গাঙ্গুলীর প্রথমপক্ষের সন্তান) একখানি জুতো পরা পা ফুটোর ভেতরেরদিকে দেখতে পেয়ে দৌড়ে পা ধরে টেনে চিৎকার করে সবাইকে জানান, ফলে সে যাত্রা সুকুমার রক্ষা পান!— আমিও ছোটবেলায় ঢের দুষ্টু ছিলুম ও আমার মাকে যথেষ্ট জ্বালাতন করতুম কিন্তু আমার মধ্যে প্রতিভার উন্মেষ তো দূর, সামান্য বুদ্ধিটুকুও ভালোমত গজালো না।ভগবানের নিয়ম বড় একপেশে বুঝলেন কিনা ! "শিবঠাকুরের আপন দেশে আইন কানুন সর্বনেশে!" যদিও সুকুমারের দিদি সুখলতা কিন্তু বড় শান্ত ও সদা গম্ভীরস্বভাবের মেয়ে ছিলেন। লীলা মজুমদার তাঁর লেখা 'পাকদন্ডী'-তে এ বিষয়ে এক ভারী মজার গল্প লিখেছেন, "জ্যাঠামশাইয়ের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের ভারী ভাব ছিল।সেই সময় রাজর্ষি প্রকাশিত হয়ে ছিল, জ্যাঠামশাই বড় মেয়ে আর বড় ছেলে সুখলতার আর সুকুমারের ডাকনাম রাখলেন 'হাসি' আর 'তাতা'। সুকুমারের তাতা নাম থেকে গেল, কিন্তু সুখলতার গম্ভীর মুখের দিকে তাকিয়ে কেউ আর তাকে 'হাসি' বলে ডাকবার সাহস পেল না।'' সর্বকনিষ্ঠ সুবিমলের নাম ছিল নানকু। লীলা মজুমদার ওঁর সম্পর্কে স্মৃতিচারণ করে বলেছেন— "নানকুদা বেজায় ভালো সঙ্গী হলেও বেশ একটু যে নিষ্ঠুর ছিল, সে বিষয় সন্দেহ নেই।আমাদের বয়স চার, পাঁচ, ছয়; ও যা বলত সব বিশ্বাস করতাম, এক রকম বলতে গেলে ওর অনুগত ভক্ত ছিলাম। রোদে তাতানো ছাদে আমাদের খালি পায়ে হাঁটাত।অন্ধকার লোহার সিঁড়ি দিয়ে একতলায় নামাত।বিকট সব গল্প বলে আলো নিবিয়ে ঘর থেকে চলে যেত।আবার কেউ পড়ে গেলে, ছুটে এসে কোলে তুলে ওষুধ দিত।"—উদ্দাম ভালোবাসা, অঢেল প্রাণপ্রাচুর্যতা, বিটকেল সব খামখেয়ালিপনা, অফুরন্ত কল্পনাপ্রবণতা ও অদ্ভুত প্রতিভার আশ্চর্য মিশ্রণ ছিলেন সুকুমার ও আর সব ভাইবোন!!
সুকুমার রায়ের মামা সতীশ্চন্দ্রও কিন্তু ভারী মজার ও রসিক মানুষ ছিলেন। বুদ্ধিমান, বিকলাঙ্গ, বিকৃত গলার স্বর ও অস্পষ্ট উচ্চারণের ( ছোটবেলায় কোল থেকে পড়ে যাওয়ায় মাথায় চোট লেগে এরকম হয়ে যান ) এই ভাইটিকে সুকুমারের মা বিধুমুখী বড় স্নেহ করতেন তাই উপেন্দ্রকিশোরের সাথে বিবাহের পর বিধুমুখী সতীশকে নিজের কাছে এনে রাখেন এবং উপেন্দ্রকিশোরও তাঁকে খুব ভালোবাসতেন।
সুকুমার রায়ের বেড়ে ওঠার পরিস্থিতি পরিবেশ ও পরিজন এমনই প্রাণবন্ত ও গুণীজন বেষ্টিত ছিল যে সুকুমারের মন-রস বিকাশ ঘটেছিল সুচারু ও সুমধুরভাবে এবং তারই ফলশ্রুতি ছিল ননসেন্স ও হাস্যরসের দীপ্তিময় প্রকাশ ও বিবিধ প্রতিভার বিকাশ।উপেন্দ্রকিশোরের এক বন্ধু বলতেন, "এ বাড়ির মানুষগুলো সব সময়েই হাসছে— বাড়িটাও যেন হাসছে!" ছেলেবেলায় সুকুমারের জীবনকে প্রভাবিত করেছেন অনেকে। তাঁদের মধ্যে বিদেশী ব্যক্তিত্বের নাম শোনা যায় তিনি হলেন ব্রাহ্ম -অনুরাগী কার্ল হ্যামাবগ্রেন যাঁকে মৃত্যুর পর হিন্দুমতে দাহ করার জন্য সে সময় প্রচুর নিন্দা ও বচসা ও সমালোচনা চলেছিল রীতিমত। ১৮৯8 সালে হ্যামাবগ্রেনের এরূপ অন্তিমযাত্রা সেসময় ছোটদের মনেও যথেষ্ট করুণ ছাপ ফেলেছিল!
সুকুমার-সাহিত্যে মজাদার আজগুবি জোড়াতাপ্পি লাগানো জীবজন্তু সৃষ্টির শুরু সুকুমারের অনেক ছোটবয়সেই লক্ষ করা যায় | পুণ্যলতা বলেছেন, "ছোটবেলা থেকে দাদা চমৎকার গল্প বলতে পারত| বাবার প্রকান্ড একটা বই থেকে নানা জীবজন্তুর ছবি দেখিয়ে টুনী (শান্তিলতা) মণি (সুবিনয়) আর আমাকে অনেক আশ্চর্য মজার গল্প বলত| বইয়ের গল্প ছাড়াও নিজের মনগড়া কত অদ্ভুত জীবের গল্প - 'মোটা ভবন্দোলা' কেমন দুলে দুলে থপথপিয়ে চলে, 'মন্তু পাইন' তার সরু গলাটা কেমন গেঁট পাকিয়ে রাখে, গোলমুখে ভ্যাবাচোখ কোম্পু অন্ধকার বারান্দার কোণে দেয়ালের পেরেকে বাদুড়ের মতো ঝুলে থাকে |" আর তাঁর জীবজন্তুর ওপর মায়াদয়াও ছিল বেশ। একবার কী হয়েছে সব ভাইবোনেরা মিলে খরগোশ পুষেছে, সেই খরগোশের আবার কয়েকদিন পর বাচ্ছা হয়েছে। সবাই মিলে বাচ্ছাগুলোকে নিচের একটা ঘরে বন্ধ করে রেখেছে। ওমা! সকালে উঠে দেখে জানলার ফাঁক দিয়ে তাদের পোষা বেড়াল কখন এসে ছানাগুলোকে খেয়ে চলে গেছে। সেই দেখে তো সবার ভয়ঙ্কর রাগ, কেউ বলে "ওকে দূর করে তাড়িয়ে দাও", কেউ বলে "খুন করেছে, হয় ফাঁসি দাও নাহলে গলা কেটে দাও", কিন্তু সবশেষে সুকুমার বললেন, "না, ওসব শাস্তি দিতে পারবে না। ও কী বোঝে? মরা বাচ্চাগুলোকে দেখিয়ে ওকে বেশ করে পিট্টি দিয়ে দাও, তাহলেই আর কখনও এমন করবে না।" এহেন হালকা শাস্তি কারোর পছন্দ হল না, সবাই মিলে বিচার চাইতে গেল সুপ্রিম কোর্ট অর্থাৎ উপেন্দ্রকিশোরের কাছে, তিনি সবটা শুনে সবাইকে অবাক করে দিয়ে প্রায় একই কথা বললেন, "ও তো জানে না, ওর খাদ্য ও পেয়েছে তাই খেয়েছে। আমাদেরই আরও সাবধান হওয়া উচিত ছিল, যাতে ও নাগাল না পায়।" সুকুমারের মনে যে শুধু পশুপাখিদের প্রতি মমতা ছিল তা নয় তাঁর ভাইবোনদের প্রতিও তাঁর ভালোবাসা ছিল অগাধ। এ প্রসঙ্গে পুণ্যলতা একটি ঘটনা বলেছেন... "একবার আমরা তিনজনে তবে ফুলগাছ লাগলাম। দিদি আর সুরমামাসীর গাছে কি সুন্দর নীল রঙ্গের ফুল ফুটল, আর আমার গাছে সাদা কুঁড়ি ধরল দেখে আমার ভারি দুঃখ হল। পরদিন সকালে উঠে দেখি, আমার গাছে ওদের চেয়েও সুন্দর নানা রঙ্গের ফুল ফুটেছে। আমার তো আনন্দ আর ধরে না। অনেকক্ষণ পরে মেজেতে রঙ্গের ছিটা দেখে লক্ষ্য করে বুঝতে পারলাম যে, ওগুলো আসল রঙ্গীন ফুল নয়, কোন ভোরে উঠে দাদা রং তুলি নিয়ে আমার সাদা ফুলগুলোকে রঙ্গিয়ে দিয়ে গিয়েছে।"
একবার দেশের বাড়িতে সুখলতা, সুকুমার ও পুণ্যলতা পুকুরের ফাঁকা ঘাটে তিনজনে বসে আছেন। হটাৎ সেখানে দশাসই চেহারার এক লোক এসে উপস্থিত, তার হাতে রক্তমাখা ছুরি যার গা দিয়ে তখনও রক্ত গড়াচ্ছে, তার দু'হাত মাখা রক্ত। দুই বোনের তখন আত্মারাম খাঁচাছাড়া হওয়ার জোগাড়, সুকুমার লোকটার সামনে বুক ফুলিয়ে দাঁড়ালেন, পরে জানা গেল বেচারা লোকটা তাঁদেরই বাড়িতে পাঁঠা কেটে হাত ধুতে পুকুরে গেছিল আর এদিকে এঁরা সবাই লোকটাকে খুনে-ডাকাত ভেবে বসে আছে। সেসময় মাত্র ছ'বছর বয়সী সুকুমারের অসীম সাহস দেখে সবাই অবাক হয়েছিল— যতইহোক তিনি তো ডাকাবুকো দ্বারকানাথ গাঙ্গুলির নাতি ছিলেন, সাহস তো তাঁর রক্তে!
মনঃস্তত্বের ক্লাসে শিশুমনোবিজ্ঞান পড়ানোর সময় এক শিক্ষিকা আমাদের বলেছিলেন যে শিশুর মনভাব গঠন বা মনোবিকাশ কী ভাবে হচ্ছে তা বোঝার জন্য শিশু কী খেলছে বা কীভাবে খেলছে ও কীধরণের খেলা পছন্দ করছে তা মন দিয়ে পর্যবেক্ষণ করা উচিত। এ প্রসঙ্গটি এখানে উত্থাপন করার হল পুণ্যলতার তাদের শৈশবের একটি খেলাসংক্রান্ত স্মৃতিচারণা, ছোট সুকুমার 'রাগ বানানো' বলে একটি খেলা তৈরী করেছিলেন। যেখানে 'হয়ত কারো ওপর রাগ হয়েছে অথচ তার শোধ নিতে পারছি না , তখন দাদা বলত "আয়, রাগ বানাই"। বলেই সে লোকটার সম্বন্ধে যা তা অদ্ভুত গল্প বানিয়ে বলতে আরম্ভ করত। তার মধ্যে বিদ্বেষ বা হিংস্রভাব কিছুই থাকত না, সে ব্যক্তির কোনো অনিষ্ট চিন্তা থাকত না, শুধু মজার মজার কথা। যত রকম বোকামি হতে পারে, যত রকমে মানুষ নাকাল ও অপ্রস্তুত হয়ে হাস্যাস্পদ হতে পারে, সব কিছু সেই লোকটির সম্বন্ধে কল্পনা করে আমরা হেসে কুটিপাটি হতাম। দাদার "হ য ব র ল" বইয়ের "হিজি-বিজ্-বিজ্" যেমন "মনে কর— বলে যত রকম উদ্ভট কল্পনা করে নিজে নিজেই হেসে দমবন্ধ হবার উপক্রম করে, আমাদেরও প্রায় সেই দশা হ'ত | কিন্তু মজা এই যে , হাসির স্রোতে রাগটাগ সব কোথায় ভেসে যেত, মনটা আবার বেশ হাল্কা খুশীতে ভরে উঠত।"
—এমনই অসূয়া ও বিদ্বেষবিহীন ছিল সুকুমার-শৈশব ও সুকুমার-সাহিত্য।
তখন তাঁর বছর আটেক বয়স। ছন্দশিল্পী সুকুমারের জীবনের প্রথম ছন্দটি ধ্বনিত হল 'নদী' কবিতার মাধ্যমে শিবনাথ শাস্ত্রীর সম্পাদনায় 'মুকুল' পত্রিকায় এবং তারপর ১৩০৪ সালের সেখানেই প্রকাশিত হল তাঁর 'টিকটিক টং' কবিতাটি যেটি ছিল Nursery Rhyme 'Hickory Dickory Dock'-এর ভাবানুবাদ। যদিও ছন্দ তাঁর চারপাশে ঝংকৃত হত সর্বদা তাই সেটি তাঁর অস্থি-রক্ত-মজ্জায় মিশে ছিল। ছেলেবেলায় তাঁরা সব ভাইবোনেরা ও বাবাকাকারা মিলে একটি খেলা খেলতেন, খেলাটি এইপ্রকার— যে কোন একটি গল্প নিয়ে একজন প্রথম লাইন বলবে ও পরের জন দ্বিতীয় লাইন, পরের জন তৃতীয় লাইন, কিন্তু শর্ত ছিল গোটা গল্পটি এগোবে লাইনে ছন্দ বজায় রেখে। একদিন খেলা চলছে 'বাঘ ও বক'-এর গল্প :
"একদা এক বাঘের গলায় ফুটেছিল অস্থি।"
"যন্ত্রনায় কিছুতেই নাহি তার স্বস্তি।"
"তিনদিন তিন রাত নাহি তার নিদ্রা।"
"সেঁক দেয় তেল মেখে লাগায় হরিদ্রা।"
গল্প চলতে চলতে তাঁদের কাকা মুক্তিদারঞ্জন বললেন—
"ভিতরে ঢুকায় দিল দীর্ঘ তার চঞ্চু।"
আর কেউ ছন্দ মেলাতে কিছুতেই পারছে না, সবাই 'পাস্' দিচ্ছে কিন্তু সুকুমার ছিলেন হার না মানা মানুষ তিনি অমনি বলে উঠলেন,
"বক সে চালাক অতি চিকিৎসক চুঞ্চু।"
যদিও সব ভাইবোনেরা 'চুঞ্চু' শব্দটি কোন শব্দই নয় বলে বিস্তর চেঁচালেও তাঁর কাকা সুকুমারের পিঠ চাপড়ে বলেছিলেন 'চুঞ্চু' মানে ওস্তাদ, এক্সপার্ট। পাঠককুল যাঁরা সুকুমার সাহিত্য পড়েছেন ছন্দের কারসাজিতে সুকুমার যে কীভাবে 'চুঞ্চু' হয়ে উঠেছিলেন তা আশা করি এবার বুঝতে পারছেন। সুকুমার রায়ের খুড়তুতো বোন অর্থাৎ উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর ভাই কুলদারঞ্জনের কন্যা মাধুরীলতা একধরণের নাটকের কথা বলেছেন যেটা তাঁরা সব ভাইবোনেরা মিলে ছোটবেলায় খুব খেলতেন,
"....সন্ধ্যেবেলায় সেই নাটক সুকিয়া স্ট্রিটের বাড়ির উপরের প্রকান্ড হলঘরে খুব জমতো। সব জ্যাঠতুতো খুড়তুতো ভাইবোনেরা আসতেন— হিতেন বোস, অশীন বোস, শৈলজারঞ্জন, হৈমজারঞ্জন। ময়না, মালতী আমরা সব ছোটো ছোটো গুড়ি গুড়ি মেয়েরা বসে, আর বাকি সবাই দাঁড়িয়ে। প্রকান্ড এক বিছানার চাদর মুড়ি দিয়ে লাইন করে আঠারোজন দাঁড়ালেন। দাদা বললেন, 'সব স্ত্রোত্র পড়। স্বর্গে যাবার মন্ত্র পড়।' অমনি তালে তালে বলা হলো,
হলদে সবুজ ওরাং ওটাং
ইঁটপাটকেল চিৎপটাং
গন্ধগোকুল হিজিবিজি
নো অ্যাডমিশন ভেরি বিজি
নন্দী ভৃঙ্গী সারেগামা
নেই মামা তাই কানা মামা
মুশকিল আশান উড়ে মালি
ধর্মতলায় কর্মখালি
চিনেবাদাম সর্দিকাশি
ব্লটিংপেপার বাঘের মাসি।
হটাৎ সেই চাদরের মধ্যে থেকে দাদা বলে উঠলেন, 'এই রে, উল্টোদিকে নেমে যাচ্ছি। স্বর্গে যাচ্ছি নে, নেমে যাচ্ছি পাতালে। ভুল হলো। ভুল মন্ত্র। আরেকটা পড়।' তখন আবার,
ভাব এক্কে ভাব, ভাব দুগুণে ধোঁয়া,
তিন ভাবে ডিসপেপশিয়া— ঢেঁকুর উঠবে চোঁয়া
চার ভাবে চতুর্ভূজ ভাবের গাছে চড়—
পাঁচ ভাবে পঞ্চত্ব পাও , গাছের থেকে পড়।…
তারপর এ ওর ঘাড়ে গুঁতো দিয়ে, ধাক্কা লাগিয়ে সব গড়াগড়ি যেতে লাগলেন। আমাদের খুব মজা লাগতো।"
আর একটা খেলার কথাও তিনি বলেছেন, ওই খানিকটা অন্তাক্ষরীর মতোই শুধু তফাৎ যে গানগুলো অবশ্যই রবীন্দ্রনাথের একটা গান হতে হবে, লাইনের শেষ অক্ষর দিয়ে আরেকটা গান শুরু করতে হবে, যেমন 'এমনি করে যায় যদি দিন যাক না'। এবার 'না' শব্দ দিয়ে আর একজন ধরলো 'না না গো না, কোরো না ভাবনা', এভাবেই রবি ঠাকুরের গানের লম্বা রেলগাড়ি চলতো।
আবার আর একধরণের খেলা ছিল ভেংচি কাটা— কে কত ভালো ভেংচি কাটতে পারে। সুকুমার রায়ের পরের বোন অর্থাৎ মেজোবোন পুণ্যলতা নাকি দস্তুররকম ভালো ভেংচি কাটতে পারতেন, এমনকি তাঁর ৮০ বছর বয়সেও তিনি ভেংচি কাটায় বেশ দর ছিলেন।
সুকুমার রায়ের লেখনী চিরকালই খানিক অন্যরকম, ভিন্ন গতে চলা। তাঁর লেখায় একটা সবুজগন্ধ আছে, হরেকরকম ছন্দ আছে, মিষ্টিমধুর দ্বন্ধ আছে, খোলা মাঠ আছে, কত শত জীবজন্তু আছে— তা সে নাহয় হোক জগাখিচুড়ি, আজব কল্পনায় ভর দিয়ে যাক না উড়ে শিশুরা গজব দেশে। বড়দের দুনিয়াটা যে বড় নিষেধে ঠাসা, সব নিখুঁত চাই, এতটুকু নিয়মের নড়চড় নাই!
"হেথায় নিষেধ নাইরে দাদা,
নাই রে বাঁধন নাইরে বাধা।
হেথায় রঙিন আকাশ তলে
স্বপন দোলা হাওয়ায় দোলে
সুরের নেশায় ঝরনা ছোটে,
আকাশ কুসুম আপনি ফোটে
রাঙিয়ে আকাশ, রাঙিয়ে মন
চমক জাগে ক্ষণে ক্ষণ। "
সুকুমার রায়ের এই নিয়মভাঙা হিসাবহীন সাহিত্যের শেকড় ছিল তাঁর ছোটবেলায় যাওয়া স্কুলটি যেটি গড়পড়তা আর পাঁচটা স্কুলের মত ছিল না। এটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন শিবনাথ শাস্ত্রী। তিনি ১৮৮৮ খ্রিস্টাব্দে ইংল্যান্ডের কিন্ডারগার্টেন স্কুল দেখে উদ্ভুদ্ধ হয়ে এখানে সেরূপ স্কুল তৈরী করার পরিকল্পনা করেন। কিন্ডারগার্টেন স্কুলগুলি খেলাচ্ছলে শিশুদের শিক্ষাদানের যে পদ্ধতি অবলম্বন করেছিল, সেই অনুসারে ব্রাহ্ম বালিকাবিদ্যালয়ে গান শেখানো, ছড়ার বলার সাথে বিভিন্ন রকমের খেলা বা শিক্ষকদের পরিচালনায় পিকনিক করা কিংবা চিড়িয়াখানা বা বোটানিক্যাল গার্ডেনে বেড়াতে যাওয়া হত। এর সাথে অবশ্য চলতো 'রবিবাসরীয় নীতি বিদ্যালয়ের' (এটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন শিবনাথ শাস্ত্রী, উপেন্দ্রকিশোর প্রমুখ) ক্লাস, এবং সেই ক্লাসে গান শেখাতেন উপেন্দ্রকিশোর স্বয়ং। শিশুমনে সুরের যে কি অপরিসীম মহিমা তিনি বিলক্ষণ জানতেন যে! স্কুলখানি ভারী মজাদার ছিল সুকুমার ও ভাইবোনদের কাছে। একজন শিক্ষিকা ছিলেন তাঁদের নীতিশিক্ষার ক্লাস নিতেন নানা গল্প কবিতা ও জীবনচরিত বলার মাধ্যমে; এছাড়া বাবা উপেন্দ্রকিশোরের কাছ থেকে তাঁরা বিজ্ঞান, ভূগোলের কত কি যে শিখতেন, পরবর্তীকালে যার প্রভূত নিদর্শন ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল সুকুমার-সাহিত্যে।
১৮৯৫ সালে উপেন্দ্রকিশোর পরিবারসহ চলে আসেন কর্নওয়ালিস স্ট্রিটের বাড়ি ছেড়ে ৩৮/১, শিবনারায়ণ দাস লেনের একটি বাড়িতে। এই বাড়ির কয়েকটা ঘর নিয়ে শুরু হয় ইউ.রায়.আর্টিস্ট নামে ব্যবসা। এ বাড়িতেও থাকাকালীন ঘটতো নানারকমের মজার কান্ড। টুনী (শান্তিলতা) ও মণি (সুবিনয়) এই দুজনের স্বভাব ছিল মাটিতে বইপত্র, জিনিস ছড়িয়ে রাখা। একদিন এই ভাইবোনদের মাস্টারমশাই সুকুমারকে বলেন, "ওদের জিনিসপত্র যা কিছু এদিক-ওদিক পড়ে থাকবে তুমি তা বাজেয়াপ্ত করে তোমার ডেস্কে রাখবে।" সুকুমার সেকথা শুনে সবার যা জিনিস মাটিতে ছিল সব কুড়িয়ে তার ডেস্কে পুরে দিলেন। সেখানে ছোট বোন টুনীও মাটিতে বসে কিছু করছিল, সুকুমার তাকেও তুলে ডেস্কে পুরে দিলেন। ভাগ্যিস নিঃশ্বাস নেওয়ার জন্য ডালাটা একটু ফাঁক করে রেখেছিলেন। ওদিকে টুনীর চিলচিৎকার শুনে দিদি সুখলতা ও মাসী সুরমা এসে তাকে ডেস্ক থেকে বের করেন। সুকুমার অবশ্যি এর উত্তরে একটাই কথা বলে যাচ্ছিলেন, "মাস্টারমশাইয়র অর্ডার— যা কিছু মাটিতে পড়ে থাকবে তাই ডেস্কে ভরতে হবে"!! এ বাড়িতে আসা পরই সুকুমার ভর্তি হন সিটি কলেজিয়েট স্কুলে নয়বছর বয়সে। স্কুলে সবার প্রিয় বন্ধু , প্রিয় ছাত্র ও দলের নেতা হওয়া সত্ত্বেও নেতাগিরি তিনি কখনোই ফলাতেন না (তবু তিনি ভোলানাথের সর্দারি গল্পখানা ভালো জমিয়েছিলেন), তবে তাঁর স্বভাবখানা ছিল কোমলে কঠোর।তাঁর ঘনিষ্ট বন্ধুর দু'জনের নাম জানা যায়— সুধীরকুমার সেন (চন্ডীচরণ সেনের পুত্র ও কবি কামিনী রায়ের ভাই) ও মণিমোহন সেন। স্কুলে নাকি তিনি একজন বায়োস্কোপ অপছন্দ করা টিচারকে 'লে মিজারেবল' দেখিয়ে বয়োস্কপের সম্বন্ধে তাঁর মনে যে ভুল ধারণা জন্মেছিলো তা চিরতরের মত দূর করে দিয়েছিলেন। সেই টিচার তাঁকে ধন্যবাদ দিয়ে বলেছিলেন "তুমি আমার মস্ত ভুল ভাঙিয়ে দিলে।বায়োস্কোপের ছবি যে এত ভাল হয়, সে ধারণা আমার ছিল না।"—এইভাবেই এগিয়েছে তাঁর জীবনের গতিপথ।এরপর ১৯০২ সালে তিনি পাস্ করলেন এন্ট্রান্স ও ১৯০৪ সালে এফ . এ -তে ভর্তি হলেন প্রেসিডেন্সি কলেজে।
'মন্ডা ক্লাব'-এর জন্ম, 'ননসেন্স ক্লাব' গড়া, 'সাড়ে বত্রিশ ভাজা' নামের কাগজ বের করা, 'আবোল-তাবোল' ও সুকুমার-সাহিত্যের সৃষ্টি , ইউরোপের 'শারাড'(charade) নামের নাট্যখেলার অনুকরণে তাঁর হাস্যকৌতুক নাট্য বা হেঁয়ালিনাট্য, তথাকথিত কোনো আর্ট কলেজের গিরিম্ভারী ডিগ্রী না থাকা সত্ত্বেও ইলাস্ট্রেশনকে এক অন্যমাত্রায় নিয়ে যাওয়া, শিল্পচিন্তা ও চিত্রচর্চাকে ('ভারতীয় চিত্রশিল্প' ও 'ভারতীয় চিত্রকলা' এবং 'শিল্পে অত্যুক্তি' নামে তিনটি প্রবন্ধ তিনি লেখেন) অন্য ধারায় মানুষের কাছে তুলে ধরার মানুষটিই হলেন সুকুমার রায় যাঁর প্রস্তরভীত গড়ে উঠেছিল ছোটবেলায় বিভিন্ন গুণীমানুষের সান্নিধ্যের ছেনি হাতুড়ির স্পর্শে। এমনকি সুকুমার রায় নিজে অভিনয় করতেনও চমৎকার, 'ননসেন্স ক্লাব'-এর বিভিন্ন নাটকে তিনি নিজেই অভিনয় করতেন যদিও সে নাটক হত নিতান্তই আড়ম্বরহীন এবং তিনি নাটক শেখাতেনও, সুকুমার তাঁর খুড়তুতো বোন বুলুকে "লক্ষ্মীর পরীক্ষা" নাটকে 'ক্ষীরি ঝি'-এর পার্ট এমন শিখিয়েছিলেন যে আসল ঝি কোথায় লাগে, যেমনি তার অঙ্গভঙ্গি তেমনি তার মুখভঙ্গি— সবাই তো প্রশংসায় পঞ্চমুখ!!
পুণ্যলতা চক্রবর্তী লিখেছেন, "বাঁধা স্টেজ নেই, সীন নেই, সাজসজ্জা ও মেক্আপ্ বিশেষ কিছুই নেই, শুধু কথায়, সুরে ভাবে-ভঙ্গীতেই তাদের অভিনয়ের বাহাদুরি ফুটে উঠত। দাদা নাটক লিখত, অভিনয় শেখাত, আর প্রধান পার্টটা সাধারণত সে নিজেই নিত। 'প্রধান' মানে সবচেয়ে বোকা আনাড়ির পার্ট! হাঁদারামের অভিনয় করতে দাদার জুড়ি কেউ ছিল না!"— হাঁদারাম-গঙ্গারামের পার্ট যে তাঁর অপেক্ষা কেউ ভালো করবে না তা তাঁর 'পাগলা দাশু' যে পড়েছে সে জানে, অমন পার্ট সুকুমার ছাড়া কেউ লিখতে পারবেনও না। আর যাঁরা সুকুমার রায়ের লেখা সন্দেশে "ভাবুক সভা" পড়েছেন তাঁরা জানেন সেটি কী ডেঞ্জারাস রসাত্মক লেখা! সুকুমার রায় মাঝে তাঁর নিজের লেখা এই "ভাবুক সভা" কিংবা "চলচ্চিত্ত-চঞ্চরি" পড়ে সকলকে শোনাতেন, লেখা পড়ার ধরণ আর তার সাথে বিচিত্ররূপে হাত-পা নাড়া ও মুখভঙ্গিমা সে লেখাকে রসের এমন উচ্চমার্গে প্রতিষ্ঠিত করতো যে লোকজন হাসতে ভুলে গিয়ে মোহাবিষ্ট হয়ে পড়তো। কোনরূপ বাহ্যিক ঘটা কিংবা জাঁকজমক ছাড়া শুধু পড়ার বিবিধ আঙ্গিকে যে কোনো লেখাকে যে এরূপ জীবন দান করা যায় তা যেন কেউ বিশ্বাসই করতে পারতো না। তারপর পড়া শেষ হলে সবাই হুঁশ ফিরে পেয়ে হাসিতে ফেটে পড়তো। গুপী গাইনের গান আর বাঘা বাইনের ঢোল শুনে যেমন সবাই মন্ত্রমুদ্ধের মত নট নড়নচরন হয়ে যেতো এও খানিক তেমনিই। ছেলেবেলায় অনেক সময় বিকেলবেলা ছাদে অভিনয় দেখার জন্য অনেক লোক জড়ো হত, পুণ্যলতা ও সুকুমার 'ইঁদুর ভায়া', 'নাপতে-ভায়া', 'গণেশ বাবু'— নানারকম কবিতা বিচিত্র মুখভঙ্গির সাথে করে দেখাতেন। সুকুমার বিভিন্নরকমের মুখ করতেন— 'হাসি মুখ', 'কান্না মুখ', 'ভয় মুখ', 'অদ্ভুত বিকট মুখ'... সুকুমার অনেকপ্রকার সাজগোজ ও ছদ্মবেশ নিতে পারতেন। একবার সেজে ছিলেন বেঁটে বামন, "মস্ত মাথায় বিরাট পাগড়ি, হাঁটু পর্যন্ত ঝোলা বিশাল দাড়ি, চোখে কালো চশমা, চওড়া কাঁধ, প্রশস্ত বুক, সুপুষ্ট লম্বা দুই হাত, আর ক্ষুদে হাফ-প্যান্ট পরা, বেবী শু ও মোজা পড়া, ছোট্ট বেঁটে বেঁটে দুটি পা!"— দাঁড়িয়ে আছে টেবিলের ওপর আর তারসাথে কী হেঁড়ে গলার বক্তৃতা আর হাঁড়িচাঁচা সুরে গান, বাপরে!! একবার এই বামনের দাড়ি পরে, চোখে কালো চশমা এঁটে, চোগাচাপকান আর পাগড়ি পরে সাজলেন পাঞ্জাবি জ্যোতিষী। এক বন্ধুর মায়ের কাছে গিয়ে সবার হাত দেখে সব পট পট বলে দিচ্ছেন (সবাইকেই তিনি চেনেন তাই সবই তাঁর জানা), বন্ধুর মা তো শেষে ভক্তিতে গদগদ হয়ে ঢিপ করে একটি পেন্নাম সেরে নিলেন সুকুমার ওরফে গণকঠাকুরের শ্রীচরণে। আর থাকতে পারলেন না সুকুমার, ব্যস্তসমস্ত হয়ে উঠে বসলেন। বন্ধুটি তাঁর দাড়ি আর পাগড়ি খুলে দিয়ে বললে, "এহঃ— কাকে প্রণাম করলে, মা?" সবাই চমকে উঠলেন ওদিকে গণকঠাকুর ততক্ষণে পগার—পা!! লীলা মজুমদার বলেছেন, "মোট কথা, বড়দা আমাদের প্রথম ও শেষ হাসির পাঠ দিয়েছিলেন। জ্যাঠামশায়ের লেখায় যথেষ্ট সরসতা ছিল, কিন্তু সে-সব হল প্রাসঙ্গিক হাসি, আর বড়দার বেলায় হাসিটাই ছিল প্রসঙ্গ। সেই হাসি ধরিয়ে দিলেন বড়দা।নিজে যখন চলে গেলেন, তাঁর বয়স ছত্রিশ, আমার বয়স পনেরো, তবু সে রসটুকু আজ পর্যন্ত মনের মধ্যে লেগে রইল।"
সুকুমার রায় যখন মারা গেলেন তাঁর বয়স মাত্র ছত্রিশ, সত্যজিৎ তখন নেহাৎই শিশু, দু'বছর বয়স। ২৮ বছর বয়সে যখন বাবা উপেন্দ্রকিশোর মারা গেলেন তারপর থেকে সব দায়িত্ব সুকুমার নিজের ঘাড়ে তুলে নিলেন তিনি, সংসার থেকে সন্দেশ— সবটা। জমিদারি দেখতে গেলেন ময়মনসিংহে, ফিরলেন কালাজ্বর নিয়ে। একপ্রকার মাছিবাহিত এ রোগে যকৃৎ, প্লীহা ও অস্থি-মজ্জাতে প্রবল সংক্রমণ হয়। আর তখনও এর কোনো চিকিৎসাও ছিল না (সবে ১৯২২ সালে তখন ভারতীয় বিজ্ঞানী ও চিকিৎসক উপেন্দ্রনাথ ব্রহ্মচারী কালাজ্বরের টিকা আবিষ্কার করেছেন), সেসময় লোকে নাকি বলতো কালাজ্বরের রুগী কোনোপ্রকারে একবছর বেঁচে গেলে ও রোগ আর কিছু করতে পারবে না, কিন্তু সুকুমার রইলেন না। সুবিমল রায় তিব্বতি বাবা নামে এক সাধু নিয়ে এলেন রোগ নিরাময়ের জন্য, তিনি নিমের ডাল, লাউয়ের খোলা ইত্যাদি দিয়ে চেষ্টা করলেন কিন্তু কিছুই হল না। জ্বর একবার যায় আবার ফের আসে। খেতে পারেন না , শুয়ে থাকেন, যদিও এত রোগের মধ্যেও তিনি ঘরে একখানি গদিআঁটা আরাম কেদারায় বসে কাজকর্ম দেখতেন, বই লিখতেন। বন্ধু প্রশান্ত মহলানবিশকে বলতেন, "প্রশান্ত, আমি বইটা লিখে নিই। শেষ করে নিই, তারপর যাবো।" বোধ করা হয় 'আবোল-তাবোল' -এর কথাই বলতেন। রবীন্দ্রনাথকে দেখতে চাইলেন একদিন, প্রশান্ত মহলানবিশ গিয়ে তাঁকে ডেকে আনলেন, সুকুমার কবির কাছে গান শুনতে চাইলেন, কবি শোনলেন। এর কয়েকদিন পর হটাৎ একদিন ভীষণ ভূমিকম্প হল। ঘরদোর সব নড়ে উঠে আবার শান্ত হয়ে গেল। সুকুমার হটাৎ বললেন, "এবার চলি। টুলু (স্ত্রী সুপ্রভা) প্রস্তুত হও।" — এই ছিল তাঁর শেষ কথা, খুড়তুতো বোন মধুরীলতার স্মৃতিচারণে বললেন। লীলা মজুমদার বড় আক্ষেপ নিয়ে পাকদন্ডীতে বলেছেন,"বড়দা আমাদের ঘরের আলো ছিলেন। তিনি চলে যাবার পর ৫৪ বছর কেটে গেছে, তবু তাঁর পায়ের কাছে দাঁড়াতে পারে এমন আর একটিও মানুষ দেখলাম না।"
আমাদের রুদ্ধ-বদ্ধ-কড়া জীবনে সুকুমার রায় নিয়ে এসেছিলেন অচলায়তনের দেওয়াল ভাঙার আনন্দ।তাসের দেশের নিয়ম ছেড়ে লাগামছাড়া বেনিয়মে ভাসিয়েছেন আমাদেরকে। সেন্স জগৎকে ছেড়ে খেয়ালখুশির মই বেয়ে ননসেন্স জগতে পাঠিয়েছেন যেখানে রাজা আমসত্ত্ব ভাজা ফ্রেমে বাঁধিয়ে রাখতে পারেন কিংবা রানীর দাদা পাঁউরুটিতে পেরেক ঠোকেন, কুমড়োপটাশ নাচে, রুমাল বেড়াল হয়, আপাতঃ সাদাসিধে অথচ বুদ্ধিমান পাগলা দাশুর হাতে ষণ্ডাগণ্ডা ছেলেরা নাকানিচোবানি খায়। আসলে যা বাস্তবে চেয়েছি অথচ পাইনি ক্ষণিকের জন্য হলেও সুকুমার তা দিয়েছেন কল্পনার ভেলায় ভাসিয়ে, তা সে লোকে না বুঝুক বা না জানুক। তিনি তাঁর কাজ করে এসেছেন, করে যাচ্ছেন ও করে যাবেন। তাই তো ছন্দশিল্পী সুকুমার রায় শব্দকল্পদ্রুমের তাল বগলে বেঁধে জোর গলায় মৃত্যুকে শিয়রে রেখে বলে যেতে পারলেন...
"আজকে দাদা যাবার আগে
বলব যা মোর চিত্তে লাগে-
নাইবা তাহার অর্থ হোক
নাই বা বুঝুক বেবাক লোক।
আপনাকে আজ আপন হতে
ভাসিয়ে দিলাম খেয়াল স্রোতে।"
তথ্যসূত্র:
(১) ছেলেবেলার দিনগুলি— পুণ্যলতা চক্রবর্তী।
(২) সুকুমার রায়: জীবনকথা— হেমন্তকুমার আঢ্য।
(৩) পাকদন্ডী— লীলা মজুমদার।
(৪) নানা সুকুমার— কোরক প্রকাশন।
(৫) রবীন্দ্রনাথের পরলোকচর্চা— অমিতাভ চৌধুরী।
Free Website Created & Hosted with Website.com Website Builder